রাফি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পড়তে বসে গেছে। সেটা দেখে রাফির আম্মু সালেহা খানম প্রচন্ড রেগে গেলেন।
"কি ব্যাপার রাফি, তোমাকে না বলেছি সকাল নয়টার আগে ঘুম থেকে উঠবা না। আর হাতে ওটা কি? তোমার তো সাহস কম না তুমি সাতসকালে উঠে বই নিয়ে বসে গেছো।"
রাফি আমতা আমতা করে বললো, 'ইয়ে আম্মু কেমিস্ট্রির জৈব যৌগটা একটু দেখে নিচ্ছি।'
"আবার মুখে মুখে কথা বলো। রাখো বইটা। রাখো বলছি।"
কি আর করা, রাফি মন খারাপ করে বইটা রেখে দিলো।
"এইতো গুড বয়, সালেহা খানম একটু স্বাভাবিক হলেন। এবার লক্ষী ছেলের মত হাতমুখ ধুয়ে এসে ফেসবুকে লগইন করো। সকাল আটটা অব্দি টানা ফেসবুক চালাবা। আমি তোমার জন্য নাস্তা বানাতে যাচ্ছি।"
.
আম্মু চলে যেতেই রাফি ল্যাপটপে ফেসবুক অন করে ল্যাপটপের মধ্যে ফিজিক্স বইটা রেখে পড়তে লাগলো। বারবার আড়চোখে দরজার দিকে তাকাচ্ছে যেন কেউ হুট করে চলে না আসে। এমন সময় রুমে রাফির বাবা এসে ঢুকলেন। রাফি সেটা দেখে ঝটপট বইটা বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলে মনোযোগ দিয়ে ফেসবুক চালাতে লাগলো।
বাবা এসে পাশে বসলেন। বললেন, 'কি ব্যাপার রাফি, তোমার আম্মু এগুলা কি বলতেছে? তুমি নাকি সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসে যাও? ফেসবুকে একদম মনোযোগ নেই। গত একমাসে একটা মুভিও নাকি পুরোপুরি শেষ করোনি।'
রাফি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছে।
রাফির বাবা আবার শুরু করলেন, 'এভাবে চললে কি করে হবে? পাশের বাসার মাহজাবিনকে দেখ। সারাদিন টিভিতে সিরিয়াল দেখতে দেখতে ফেসবুক চালাচ্ছে। অনেক রাত পর্যন্ত ওর রুম থেকে গেমের সাউন্ড আসে। তোমার থেকে বয়সে ছোট তাও এই বয়সেই পার স্ট্যাটাসে ছয়-সাতশো লাইক পায় গড়ে। আর তুমি? এই যুগে মাত্র ত্রিশ চল্লিশটা লাইক দিয়ে তোমার কিভাবে চলবে ভেবে দেখেছ? তোমার ভবিষ্যত তো আমি ঘোর অন্ধকার দেখতেছি।'
রাফি এবারও কিছু বললো না।
রাফির বাবা বললেন, 'আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার সমস্ত বইখাতা কিছুদিন আলমারিতে আটকিয়ে রাখবো।'
রাফির বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। তাড়াতাড়ি বললো, 'না বাবা তার আর কোনো দরকার হবে না। আমি এখন থেকে ঠিকমতো সবকিছু করবো।'
"ঠিক তো? মনে থাকে যেন, রাফির বাবা বললেন। আমি আজকে কিছু হোমওয়ার্ক দিয়ে যাচ্ছি। সারাদিনে এগুলা করবা। প্রতি দুইঘন্টা পর পর ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিবা। দুইটা গেমের কমপক্ষে একটা করে লেভেল কমপ্লিট করবা। একটা মুভি পুরোটা শেষ করবা। আমি সন্ধ্যায় অফিস থেকে এসে সবকিছু দেখবো। ওকে?"
রাফি সুবোধ বালকের মত মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
.
এমনসময় একটা প্লেটে দুইটা বার্গার আর একগ্লাস কোক নিয়ে আসলেন রাফির আম্মু। খাবার দেখেই রাফি মুখ বাকালো।
"আম্মু প্লিজ আমার এগুলো খেতে একদম ভালো লাগেনা। আমি একটূ সবজি দিয়ে রুটি খেতে চাই, ঝোল তরকারি দিয়ে সাদা ভাত খেতে চাই।"
"হ্যা, সেটা তো তুমি চাইবাই। সালেহা খানম ঝাড়ি দিলেন। তোমার ঝোক শুধু ঘরের খাবারের প্রতি। বাইরের খাবার না খেতে খেতে দিনদিন শরীরটার কি হাল হয়েছে দেখেছ? ঐ যে পাশের বাসার মাহজাবিনকে দেখ, দিনে দুইটা করে পিজ্জা খায়। কোল্ড ড্রিংসের কথা তো বলাই লাগে না। মানুষ সুস্থ্য তো আর এমনি এমনি থাকে না।"
কি আর করা। রাফি মন খারাপ করে বার্গারে কামড় বসালো।
.
দুপুরে গোসল করার পর রাফি ইতিউতি তাকিয়ে সুযোগ খুজছিলো কিভাবে একটু বইটা নিয়ে বসা যায়। সালেহা খানম ওর চাহনি দেখেই বুঝে ফেললেন ব্যাপারটা। বললেন, 'কি ব্যাপার রাফি, তুমি বাইরে আড্ডা দিতে যাবা না?'
রাফি কাচুমাচু গলায় বললো, 'ইয়ে আম্মু আজ শরীরটা ভালো লাগছে না। আড্ডা দেয়ার মুড নেই একদম। আজকে বাসায় বসে রেস্ট নেই?'
সালেহা খানম রাফির চালাকি ধরে ফেলে বললেন, 'ওকে, তুমি যেহেতু অসুস্থ্য সেহেতু আজ আর বিকালে বই নিয়েও বসা লাগবে না।'
রাফি তাড়াতাড়ি বললো, 'আরেহ এখন একটু ভাল্লাগতেছে। আমি বাইরে ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দিতে যাচ্ছি।'
.
বিকালে রাফি কেমিস্ট্রি বই নিয়ে বসেছে। সালেহা খানম একবার চোখ গরম করে তাকিয়ে বের হয়ে গেলেন। কিছু বললেন না। রাফি অনুমতি আদায় করে নিয়েছে সারাদিন ফেসবুক চালাবে, গেমস খেলবে, আড্ডা দিবে; অর্থ্যাত বাবা মায়ের সব কথা শুনবে, বিনিময়ে বিকালে ঘন্টাখানেক বই পড়তে দিতে হবে।
আশেপাশের বাসার ভাবিদের বৈকালিন আড্ডায় সে'কথাই তুললেন রাফির আম্মু।
"আর বইলেন না ভাবি, ছেলেটাকে নিয়ে আছি বড় ঝামেলায়! সারাদিন আছে শুধু পড়ালেখা করার ধান্ধায়। ফেসবুকটা দিয়ে দুইটা মিনিট বসাতে পারি না। সিনেমা দেখতে বসলেই ঘুম চলে আসে তার চোখে। কতো করে বলি একটু মেয়েদের সাথে চ্যাট কর, তা না ফেসবুকে গেলে পড়ালেখার পেজে ঢুকে যায় সুযোগ পেলেই। এই ছেলের ভবিষ্যত কি হবে কে জানে!"
আশেপাশের সব ভাবিরা দীঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন। সবার বাসায়ই এই একই প্রবলেম। তারমধ্যে মাহজাবিনের মায়ের দীর্ঘশ্বাসটা ছিলো সবচাইতে দীর্ঘ। তিনি শুকনো মুখে বললেন, 'মেয়েটাকে নিয়েও খুব টেনশনে আছি ভাবী। ওর বাবা তো বলেই দিয়েছে, নেক্সট পোস্টে এক কে লাইক না পড়লে বিয়ে দিয়ে দিবেন। সেদিকে যদি ওর খেয়াল থাকে। মেয়েটাকে নিয়ে কি যে করি!'😒
.
.
#একটি_আধুনিক_রুপকথার_গল্প😂

Comments

Popular posts from this blog