নর্মালি যেকোনো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেই আমার অনেক খারাপ লাগে। খালি মনে হয়, অন্য একটা পুরুষ মেয়েটাকে পেয়ে যাবে। স্পর্শ করবে নিজের ইচ্ছামত। ফেসবুকে আমার নিউজফিডে কোনো ম্যারিড স্ট্যাটাস আসলেই সেদিন রাতে আমার ঘুম হয় না। বিছানায় এপাশ ওপাশ গড়াগড়ি করি। বারবার মনে হয়, আজ রাত টা আমার বাসর রাত হতে পারত। মেয়েটাকে আমি পেতে পারতাম। মেয়েটার সাথে হয়তো জীবনে কোনোদিন কথা হয়নি, তাতে কি? মেয়েটার বাসা হয়তো বাংলাদেশেও না, তাতে কি? হয়তো মেয়েটা বয়সে আমার বড়, তাতেই বা কি! আমার মন এগুলো কিছু শুনতে চায় না৷ সে শুধু কষ্ট পেতে চায়।
.
আমাদের পাশের বাসার সামিয়ার যেদিন বিয়ে হলো সেদিন আমি সারারাত কান্না করেছি। অথচ সামিয়াকে আমি আপু ডাকতাম। বিয়েতে বরের জুতা চুরি থেকে শুরু করে গেট ধরা, সব আমিই করেছি। অথচ রাতের বেলা মনটা ভেঙে গেল হুট করে। বারবার মনে হতে লাগলো সামিয়াকে অন্য কোনো পুরুষ স্পর্শ করবে। কি কষ্ট, কি কষ্ট! আমি চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করলাম। আম্মু আসলে বললাম, পেটে ব্যাথা। আমাকে দুইটা ঔষধ খাইয়ে দিলো। সেই ঔষধ খেয়ে সকালে পেটে তীব্র ব্যাথা শুরু হলো। হাসপাতালে ভর্তি করা লাগলো। হাতে স্যালাইনের সুচ নিয়ে শুয়ে শুয়ে আবারো প্রচন্ড কষ্টে আমার হৃদয় দ্রবিভূত হলো। হাসপাতালের পাশের কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে হচ্ছে একটা। তৃণা ওয়েডস শিমুল। অথচ এটা তৃণা ওয়েডস সোহাইল হতে পারতো। আমি আবারো কেঁদে দিলাম। নার্স ছুটে এসে ইনজেকশন দিলো। আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুমের মধ্যেই মনে হলো, আমার জীবন এতো কষ্টের কেন!
.
আমার মেজ আপুর বান্ধবী দুই বোন। লিনা, মিনা। জমজ। কি যে সুন্দর দেখতে। ওদের যেদিন বিয়ে হবে, সেদিন আমি নির্ঘাত সুইসাইড করব। এতো কষ্ট আমি নিতে পারব না। তাও যদি দুই বোনের একসাথে বিয়ে হয়, তাইলে তো কথাই নেই। আমার ভীষণ ইচ্ছা করে পৃথিবীর সব মেয়েকে বিয়ে করে ফেলতে। আচ্ছা পৃথিবীর না হোক, অন্তত বাংলাদেশের মোটামুটি সব মেয়েকে বিয়ে করতে পারলেও শান্তি হতো। অথবা আমি প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিয়ে জিনিসটাই নিষিদ্ধ করে দিব, এরকম একটা অসম্ভব ইচ্ছাও আমার মনের মধ্যে আসে। একটা মেয়েকে আমি ছাড়া অন্য কোনো ছেলে পাবে, এই জিনিসটা আমি কোনোভাবেই নিতে পারি না। আমার মনটা বড্ড নরম। রাত্রিও সেটা বলে। বলে যে, 'তোমার মত আজব ছেলে আমি আর একটাও দেখিনি! আমার খালাতো বোনের বিয়ে হচ্ছে, তুমি কেন কাঁদছ?'
আমি চোখ মুছতে মুছতে বললাম, 'তোমার বোন কি আমার বোন না?'
.
রাত্রি আমার প্রেমিকা। আমাদের দুই বছরের প্রেম। প্রেমের শুরুটা এক বিয়ের অনুষ্ঠানে। গিয়েছিলাম এক ফ্রেন্ডের সাথে, ক্যাটারিং এর কাজ করতে। অল্প কিছু উপরি ইনকামের আশায়। বউ কে দেখার পর আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। কী সুন্দর মেয়েটা! এই মেয়েকে আমি পাবো না! তার বদলে অন্য কেউ পেয়ে যাবে আজ রাতে। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো। সেটা নোটিশ করলো রাত্রি। সে এসেছিলো বরযাত্রী হয়ে৷ একপাশে বসে আমাকে কাঁদতে দেখে কাছে এসে বললো, 'বোনের বিয়েতে ছেলে মানুষ এতো কাঁদে নাকি! বোন তো পরের বাড়ি যাবেই একদিন।'
- কিয়ের বোন?
- আপনার বোনের বিয়ে হচ্ছে না?
- না তো!
- তাহলে কি হয়? আন্টি? ফ্রেন্ড?
- উহু, চিনিনা।
- আশ্চর্য! তাহলে কাঁদছেন কেন?
.
আমি তখন ভালোভাবে রাত্রির দিকে চাইলাম। চাপা নাক, উচু দাঁত, ছোট চোখ আর মুখভর্তি ব্রণ। রাত্রিকে কি অদ্ভুত সুন্দর ই না লাগছিলো। আমার মনে হলো এই মেয়ের অন্য কারো সাথে বিয়ে হলে আমি মরে যাবো৷
বললাম, 'আপনারো একদিন বিয়ে হবে অন্য কোনো ছেলের সাথে, সেটা ভেবে কাঁদছি৷ আমি ঐদিন সুইসাইড করব!'
- হোয়াট! আপনি চিনেন আমাকে?
আমি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, 'না, চিনিনা, তাতে কি? তারপরও আপনি অন্য কোনো ছেলের কেন হবেন! আমি সেটা কিভাবে মেনে নিব! আমি পারব না।'
.
আমি পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানে একই ভাবে কাঁদতে লাগলাম। বিদায়ের সময় এতো চিৎকার দিয়ে দিয়ে কাঁদলাম যে, স্বয়ং কনে কান্না থামিয়ে অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগলো। মেয়ের মা এসে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, 'কাঁদেনা বাবা, খুশির দিনে এতো কাঁদতে নেই।'
.
কনে সবার শেষে আমার কাছে বিদায় নিতে আসলো। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে মরাকান্না জুড়লাম। কনে আমার কানে কানে বললো, 'আপনি কে, আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না। আপনি কি আমার কোনো এক্স বয়ফ্রেন্ড?'
.
রাত্রি সেটা নোটিশ করেছিলো। কার থেকে যেন আমার ফোন নাম্বার নিয়ে দুইদিন পর রাতের বেলা কল দিলো। আমি তখন ফেসবুকে অপরিচিত কারো ইন এ রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দেখে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছি। রাত্রির ফোন পেয়ে দুঃখ অনেকটাই মুছে গেলো। আমরা সারারাত গল্প করলাম। দুইসপ্তাহ পর আমাদের প্রেম হয়ে গেল।
.
সেটাও দুইবছর আগের কথা। এই দুই বছরে আমাদের কত স্মৃতি, কত সুন্দর সময় কাটানো একসাথে। এতো সুখের মধ্যেও কি আমি এই দিনটার জন্যই নীরবে অপেক্ষা করে ছিলাম! আমার জীবনের সবচাইতে দুঃখের দিন৷ রাত্রি ফোন দিলো আমাকে, 'সোহাইল, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে, তুমি প্লিজ কিছু করো।'
- হ্যা করবো!
- কি করবা?
- সময়মত দেখতে পারবা।
.
বলে আমি ফোন কেটে দিলাম। ফার্মেসিতে গিয়ে ঘুমের ঔষধ কিনে আনলাম দুই পাতা। হ্যা, আমি সুইসাইড করবো। রাত্রির বিয়ে হয়ে গেলে সেই কষ্ট আমি নিতে পারব না কোনোভাবেই।
.
সামনের শুক্রবার রাত্রির বিয়ে। আর মাত্র ছয়দিন পর। তারপরই রাত্রি হয়ে যাবে অন্য কারো। ওকে স্পর্শ করবে আরেকটা হাত। আর আমাকে স্পর্শ করবে কবরের মাটি। রাত্রির শুরু হবে প্রি ওয়েডিং ফটোগ্রাফি, তার আগেই আমি ফেসবুকে শুরু করলাম, প্রি সুইসাইডাল পোস্টিং।
.
রাত বেরাতে পোস্ট করি, 'তোমাকে চেয়েছিলাম, পাইনি। এই জন্ম তাই আর কন্টিনিউ করলাম না। পরের জন্মে দেখা যাক পাই কিনা। এই জন্ম এ পর্যন্তই।'
অথবা পোস্ট করি, 'আমি পেলাম, ভালোবাসা হারানোর কষ্ট, আমার মা পাবে সন্তান হারানোর কষ্ট, আর তুমি সেদিন বাসর রাতে কি পাবে?'
এক পোলা কমেন্ট করেছে, 'ভাই, **'
.
তবে দুয়েকটা বাদে বেশিরভাগই স্যাড রিয়্যাক্ট আর কমেন্ট। আমি ফেসবুকে ভালোই ফেমাস হয়ে গেলাম। পোস্ট দিলেই দুই তিনশো রিয়্যাক্ট আসে।
.
অনেকেই মেসেজ দিয়ে বলে, 'ভাই প্লিজ লিস্টে নেন৷ আপনার টাইমলাইন তো ফ্রেন্ড করা। আপনার সুইসাইডের পর আপনার টাইমলাইনে পোস্ট করার সুযোগ চাই।'
.
আমার ভালোই লাগে। সবাই খুব উৎসাহ দেয়। মেয়েরা যে কত খারাপ হয়, সব গোল্ড ডিগার আর বারোভাতারি, এটা আমাকে জানায়। অনেকে অবশ্য সন্দেহ প্রকাশ করে। বলে যে, ভাই আপনি সত্যিই সুইসাইড করবেন তো? খুব আশা নিয়ে আছি। পরে আবার পাল্টে যাইয়েন না। কইরেন।'
কেউ কেউ রেগে গিয়ে বলে, 'আপনারা দেইখেন এই হারামজাদা শেষ পর্যন্ত সুইসাইড করবে না। এসব মেলা দেখছি। যার করার দরকার সে করে, এতো ডায়ালগ দেয় না।'
.
রাত্রি ফেসবুকে এসব দেখে। আমার বাসার সামনে চলে আসে পরদিন। বলে, এসব কি পাগলামি শুরু করছ সোহাইল?
- হাহা, আমি তো আমাদের দেখা হওয়ার প্রথম দিনই বলেছিলাম তোমার বিয়ে হলে আমি মরে যাব। তুমি অন্য কোনো ছেলের হবে, সেটা আমি মানতে পারব না।
- আরেহ, তো কিছু না করলে কিভাবে হবে। আমার আব্বুকে গিয়ে বোঝাও। বলো আমাকে ভালোবাসো। নাহয় আমাকে নিয়ে পালাও। আমিও তো তোমাকে ভালোবাসি, তাইনা? আমি কেন অন্যকে বিয়ে করব৷ তুমি স্বার্থপরের মত শুধু নিজের দিকটাই ভাবছ। আমার কি কষ্ট হবে না? আমিও কি সুইসাইড করব নাকি?
- করবা? তাইলে ঘুমের ঔষধ কই পাবা। আমার কাছে বেশি নাই, থাকলে তোমাকে দিতাম। তুমি কিনতেও পারবা না। আমার পরিচিত দোকান বলে পেরেছি৷ আচ্ছা গলায় দড়ি ট্রাই করবা?
- শাট আপ। উল্টাপাল্টা কথা না বলে বাসায় আমার কথা বলো।
.
আমি হাসলাম, 'সম্ভব না।'
- কেন?
- আমার আম্মুর হার্টে সমস্যা আছে৷ ডাক্তার বলেছে বেশি ভীড় করা যাবে না বাসায়। অথচ বিয়ে হলে তখন ভীড় তো হবেই।
- কি আশ্চর্য! এইজন্য তুমি আমাকে বিয়ে করবা না?
- আরো কারণ আছে।
- কি?
- শেরওয়ানি আর পাগড়ি পরলে আমার গরম লাগে।
.
রাত্রি রেগেমেগে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, 'মর তুই।'
হ্যা, আমার কপালে মৃত্যু ছাড়া আর কিই বা আছে! বড় দুঃখি আমি। আমার কোমল হৃদয় মেয়েদের বিয়ে সহ্য করতে পারে না। আর রাত্রি তো আমার প্রেমিকা।
.
আজ শুক্রবার। আজ নিশ্চয় রাত্রির বিয়ে হচ্ছে। আমি ফেসবুকে ফাইনাল স্ট্যাটাস দিলাম।
"চলে যাচ্ছি, সবাই ভালো থাকবেন। বিদায়!"
.
সেখানে হুহু করে স্যাড রিয়্যাক্ট আসতেছে। সবাই কমেন্ট করতেছে, 'এটা কেন করলেন। খুব মিস করবো আপনাকে ভাই।'
.
স্ট্যাটাস চরম ভাইরাল। সুতরাং অনেক নতুন নতুন মানুষ দেখেছে এটা। তারা কাহিনী না বুঝে কেউ কেউ কমেন্ট করেছে, 'করোনার মধ্যে কোথায় যান ভাই? সাবধানে যাইয়েন। ফেস মাস্ক পরে থাকবেন।'
একজন লিখেছে, 'কই যাচ্ছেন ভাই? কক্সবাজার যাওয়ার প্লান থাকলে বলব যাইয়েন না। আমি গত সপ্তাহে গেছি, অনেক ভীড়। বান্দরবান থেকে ঘুরে আসেন৷ নিরিবিলি পাবেন।'
.
আমি ফেসবুক লগ আউট করে ঘুমের ঔষধ নিয়ে বসলাম। ঠিক তখন ঘটল ঘটনাটা। বাইরের রুমে আওয়াজ হচ্ছে। কে যেন এসেছে। গিয়ে দেখি, রাত্রির বাবা বসে আছে। আমার আব্বু আম্মুও আছেন। ঘটনা কি! রাত্রি সুইসাইড করল নাকি?
.
রাত্রির বাবা আমাকে দেখে বললেন, 'রাত্রি আমার একমাত্র মেয়ে। আমি কখনো আমার মেয়েকে কাঁদতে দিইনি লাইফে৷ আজ আমার মেয়েটা খুব কান্না করতেছে। তোমার জন্য। আমি বিয়ে ভেঙে দিয়েছি। আমি ওকে তোমার হাতে তুলে দিতে চাই।'
'ধুর, একটু আত্মহত্যা করব, তাও হলো না!'
.
কাজি ডেকে আমার আর রাত্রির বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে। আজ আমাদের বাসর রাত। আমি ভয়ে ফেসবুকে যাচ্ছি না। মানুষজন আমাকে মারবে পাইলে। এমন একটা ফিলিংস হচ্ছে যে আমি সুইসাইড না করে সবার সাথে প্রতারণা করেছি। তবে ওসব মাথায় রাখার সময় না। আমি ফাইনালি কাউকে পেয়েছি। এই মেয়ে আমার, শুধুই আমার। রাত্রি লাল বেনারসি শাড়ি পরে বসে আছে বিছানার ওপর। আহা! কি অদ্ভুত সুন্দর ই না লাগছে ওকে। এই প্রথম কোনো মেয়ের বিয়ের রাতে আমার কান্না আসছে না। আমি রাত্রির পাশে গিয়ে বসলাম। রাত্রি বললো, 'এই ছেলে, ফেসবুকে গট ম্যারিড স্ট্যাটাস দেই চলো।'
আমি হাসলাম, 'চলো!'
.
পরিশিষ্টঃ রাত আড়াইটার দিকে আমি ফেসবুকে ঢুকলাম আমার বিয়ের স্ট্যাটাসে কমেন্ট দেখার জন্য। রাত্রি তখন ঘুমে। হুট করে চোখে পড়লো, ফেসবুক নিউজফিডে আমার লিস্টের সবচাইতে সুন্দর মেয়েটার বিয়ের খবর আসছে। ঐ মেয়েটাকে আজ রাতে অন্য কোনো ছেলে পেয়ে যাবে৷ অন্য কেই স্পর্শ করবে। সেটা আমি হবো না৷ প্রচন্ড কষ্টে আমার হৃদয় ভেঙেচুরে গেল। আমি একে একে পঁচিশটা ঘুমের ঔষধ খেয়ে নিলাম। এই জীবন রেখে কি লাভ! :)
Comments
Post a Comment