শাকিলের গার্লফ্রেন্ড নাবিলা মেসেজ দিয়েছে, 'আই লাভ ইউ।'
কিন্তু সমস্যা সেটা না। সমস্যা হলো মেসেজ সে শাকিলকে না, দিছে আমাকে। আর শাকিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। সেই স্কুল লাইফ থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। শাকিল কখনো আমাকে না দিয়ে একটাকার একটা চকলেটও খায়নি। ভুল বললাম। নাবিলাকে সে খাচ্ছে আমাকে ছাড়াই। কখনো অফার করেনাই যে ঠিকাছে নে, তুই অর্ধেক আমি অর্ধেক। অথচ নাবিলা চকলেট বার্গার পিজা কোক সহ দুনিয়ার সবধরনের ফার্স্টফুড থেকে বেশি সুস্বাদু। চিকেন ফ্রাই থেকে বেশি স্পাইসি, কফি থেকে বেশি হট। এতো বেশি হট যে রাতে গ্যাস ফুরাই গেলে আমরা ওর ছবি দেখায়ে গরম করে খেয়ে ফেলি। খাবার না, নিজেকে গরম করি। তারপর ঠান্ডা খাবার খাইতে খুব বেশি খারাপ লাগে না। তো সেই নাবিলা আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে। আমি জাস্ট নিজের কান চোখ মুখ নাক হাত পা সহ শরীরের কোনো জায়গাকেই জিনিসটা বিশ্বাস করাতে পারতেছি না। ভুল বললাম, শরীরের বিশেষ একটা জায়গা ঠিকই বিশ্বাস করেছে, কিন্তু ভদ্রসমাজে তার বিশ্বাসের কোনো দাম নেই।
.
যাই হোক, এখন আমার সামনে অপশন দুইটা। প্রথমজন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড শাকিল। দ্বিতীয়জন খুব বেশি সুন্দরি একটা মেয়ে নাবিলা, যে আমাকে প্রপোজ করেছে। এই দুইজনের মধ্যে আমাকে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হবে। একজনকে বেছে নিলে দ্বিতীয় জনকে হারাতে হবে। 
হিন্দীতে একটা কথা আছে, 'দোস্ত অর লাড়কি মে হামেশা লাড়কি জিততিহে।'
যার অর্থ, বন্ধুত্ব আর মেয়েমানুষের মধ্যে সবসময় মেয়েই জিতে, হেরে যায় বন্ধুত্ব।
.
কিন্তু আমি প্রথমবারের মত সিদ্ধান্ত নিলাম, বন্ধুত্বকে জিতিয়ে দেয়ার। নাবিলা যতই হট আর সুন্দরী হোক না কেন, আমি আমার বন্ধু শাকিলকেই বেছে নিব। এর পেছনে আরেকটা ছোট্ট কারণ অবশ্য লুকিয়ে আছে। সেটা হলো, আই লাভ ইউ মেসেজটা পাঠানোর ঠিক তিন সেকেন্ড বাদে নাবিলা আমাকে আরেকটা মেসেজ দিয়েছে, 'ওহহ শিট, স্যরি স্যরি। স্যরি ভাইয়া মেসেজটা আমি শাকিলকে পাঠাতে গিয়ে আপনাকে দিয়ে ফেলছি ভুল করে। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আপনাদের দুই বন্ধুরই ডিপি সেম বলে এই ভুলটা হয়েছে।'
.
সুতরাং বন্ধুত্ব আর মেয়ের মধ্যে আমার বন্ধুকে বেছে নেয়া ছাড়া সত্যিকার অর্থে আর কোনো অপশন ছিলো না। তাছাড়া এমনিতে নাবিলাকে ছেড়ে শাকিলকে বেছে নেয়ার কোনো ইচ্ছা বা শখ আমার নাই। নাবিলার মত মেয়ের জন্য আমি শাকিলের মত হাজারখানেক ফইন্নি ফ্রেন্ডরে মিথ্যা স্ক্রিনশট বানায়ে মেয়েদের ইনবক্সে ন্যুড চাওয়ার অভিযোগে তথ্য প্রযুক্তি আইনে পুলিশে ধরায় দিতে পারি। ফাসি হয়ে গেলেও আমার কিছু যায় আসে না।
.
এমন সময় ফোন বাজলো। শাকিলের কল। বললো, 'দোস্ত তোর ফ্লাট খালি থাকবে কাল?'
- খালি ফ্লাট দিয়ে কি করবি।
- আরে বুঝিস ই তো। তোর ভাবী আসবে। তুই কোথাও থেকে ঘুরে আয়।
.
আমার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হলো। বলতে পারতো, তোর ভাবী আসবে, তুইও থাকিস। একসাথে খাবো, লাঞ্চ আরকি! এই তাহলে ওর বন্ধুত্ব? আমি সেক্রিফাইস করে বন্ধুত্বকে জিতিয়ে দিলেও ওর কাছে সবসময় মেয়েদেরই জিত। মাথায় বুদ্ধি আসলো। বললাম দোস্ত, তোর জন্য একটা খুব খারাপ খবর আছে।
- কি খবর? আঙ্কেল আন্টি ঠিক আছে?
- হ্যা আছে, বিষয়টা ভাবিকে নিয়ে।
- তোর ভাবীর এখনো বাচ্চা হচ্ছেনা যে? এবিষয়ে আমার কি করার আছে বল?
- হারামজাদা, ভাবী মানে নাবিলা।
- ও আচ্ছাহ, কি হয়েছে। বল বল। 
- না থাক।
- আরে বল প্লিজ।
- কিন্তু তুই নাবিলাকে বলতে পারবি না। আমি ওকে কথা দিছি কেউ জানবে না।
- আচ্ছা ঠিকাছে, বলব না।
.
আমি লাস্টের স্যরি বলা মেসেজটা ডিলিট দিয়ে শুধু নাবিলার পাঠানো আই লাভ ইউ এর স্ক্রিনশট নিয়ে শাকিলকে দিলাম। বললাম, 'আমি ওকে বুঝিয়ে বলেছি কিন্তু ও তারপরও তোকে ছেড়ে আমার লাইফে আসতে চাচ্ছে। এই যে বললি কাল ফাকা ফ্লাটে আসবে ও, এই অফার আমাকে আগে দিয়েছিলো। কিন্তু তোর মুখের দিকে চেয়ে আমি রাজি হইনি। হাজার হোক, আমার কাছে সবার আগে বন্ধুত্ব। আর আমি নাবিলাকে কথা দিয়েছি এসব তোকে বলব না। তাই তুই ওকে বলিস না যে আমি বলে দিছি। তাহলে আমাদের সাথে নাবিলার মত মেয়ের পার্থক্য কি থাকলো?'
শাকিল অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, 'এখন আমার করণীয় কি? কি বলিস?'
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখ দুঃখ গলায় বললাম, 'নাবিলাকে কিছু না জানিয়ে তুই সরে যা ওর লাইফ থেকে। সবকিছুতে ব্লক করে দে। ও নিজেই বুঝে নিবে। দুনিয়ায় কি ভালো মেয়ের অভাব নাকি?'
.
সুতরাং ঘন্টাখানেক বাদেই শাকিলের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে নাবিলা আমাকে ফোন দিলো। আমার গলায় এবার আরো দুঃখ। বললাম, 'দেখ নাবিলা, একটা ছেলেকে সবচাইতে ভালোভাবে জানে তার বাবা মা ভাই বোন প্রেমিকা না, তার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার খারাপ লাগছে, তাও বলি, শাকিলের মত বাজে ছেলে আমার লাইফে আমি আর একটাও দেখিনি। ব্রাজার্স ইউনিভার্সিটির ক্লাসরুমেও না। ও কি পরিমানে লুচ্চা তুমি ভাবতেও পারবা না। এর আগেও বহু মেয়ের সাথে প্রেম করে ফিজিক্যাল করার হয়ে গেলে ব্লক করে দিয়েছে। তুমি সম্ভবত তেইশ নাম্বার হবা।'
নাবিলা সত্যি সত্যি কেঁদে দিলো। বললো, 'কিন্তু আমি ওকে ভালোবেসেছিলাম নিজের থেকেও বেশি।'
- জানি আমি। এজন্যই তোমার জন্য আমার খারাপ লাগাটা বেশি।
- আপনি প্লিজ ওকে একবার আমার সাথে দেখা করতে বলেন।
- উহু, সেটা আমি বলব না তোমার ভালোর জন্যই। অন্য কোনো মেয়ে হলে আমার সমস্যা ছিলো না। কিন্তু নাবিলা, তুমি অনেক ভালো একটা মেয়ে। একবার ব্লক করে দেয়ার পর সেই মেয়ের কোনো মূল্য শাকিলের কাছে থাকেনা। শাকিল তার সাথে যা খুশি করতে পারে। একবার তো একজনের হাতের রগ অব্দি কেটে দিয়েছিলো। তাই আমি তোমার ক্ষেত্রে এই রিস্ক নিতে চাইনা। তুমি ওকে ভুলে যাও। দুনিয়ায় ভালো ছেলের কোনো অভাব নাই। তোমার আশেপাশে দেখে এরকম কাউকে খুজে নাও। সবসময় খেয়াল করে দেখবা, খুব বেশি খারাপ ছেলের বেস্টফ্রেন্ডরা সবচাইতে ভালো, অনেস্ট আর ডিসেন্ট হয়। একদম পারফেক্ট প্রেমিক ম্যাটেরিয়াল। কোনো তাড়াহুড়া নাই, তুমি আস্তে আস্তে নিজেকে সামলাও। যেকোনো হেল্পের জন্য আমি তো আছিই।'
নাবিলা ঠিকাছে ভাইয়া বলে কাঁদতে কাঁদতে ফোন রেখে দিলো।
.
কয়েকদিন পর এক সকালে শাকিল বললো, 'দোস্ত আমি নাবিলাকে ভীষণ মিস করছি। আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছা হচ্ছে মরে যাই। কি করবো বল!"
আমি রাগ দেখালাম, 'মরতে ইচ্ছা হলে মইরা যা। আমাকে বিরক্ত করিস না। আমি বিজি, এক জায়গায় যাচ্ছি।'
.
যাচ্ছিলাম কফি হাউজে নাবিলার সাথে দেখা করতে। ব্রেকাপের পর বেচারি অনেক কষ্ট পাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মোর‍্যাল সাপোর্ট দেয়া আমার দায়িত্ব। 
.
আমি নাবিলাকে নানাভাবে বুঝালাম, 'এখন তোমার উচিত শাকিলকে ভুলে গিয়ে নতুন কারো সাথে প্রেম করা।'
নাবিলা বললো, 'আমি আপাতত এগুলা ভাবছি না।'
- কিন্তু তোমার ভাবা উচিত। শাকিলকে মিস করার কষ্ট পুরোপুরি ভুলে যাওয়ার জন্য এর চাইতে ভালো উপায় আর নাই।'
- কিন্তু আমি যে পারি না। সব ছেলেকেই আমার ধোঁকাবাজ মনে হয়।
- তোমার ধারণা ভুল। এই যে আমাকেই দেখ না। কোনোদিন কোনো মেয়ের ফিলিংস নিয়ে খেলা করিনি। স্বপ্নের মেয়েটার জন্য এখনো সিঙ্গেল আছি। তাকে পেলে সারাজীবন আগলে রাখবো। তোমারো উচিত আমার মত কাউকে খুজে বের করে প্রেম করা।
- ইস, কি যে বলেন! লজ্জা পেলো নাবিলা। আচ্ছা আপনার স্বপ্নের মেয়ে কে?
- কে সেটা জানিনা। শুধু অপেক্ষা করে আছি কারো জন্য। আমার কেমন মেয়ে চাই জানো? যে কোনো ছেলের কাছে প্রতারিত হয়ে এসেছে। আমি তাকে ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাই সব ছেলেই খারাপ না।
- বাহ, ভালো তো।
- হ্যা নাবিলা। তোমাকে আরেকটা পরামর্শ দেই। তুমি এমন কাউকে লাইফে বেছে নাও যে তোমার আর শাকিলের ব্যাপারে সব জানে। অপরিচিত কেউ রিলেশনের পরে জানলে অনেক ঝামেলা করবে। আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে। তুমি খুজে দেখ আশেপাশে এমন কাউকে পাবে যে তোমার সবকিছু জেনেও তোমাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। সে মনে করে সব দোষ শাকিলের, তুমি নির্দোষ। ইভেন আমিও এটাই মনে করি। তোমার কোনো দোষ নাই।'
.
এরমধ্যে কেটে গেছে দুই মাস। আমি নাবিলাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে আমিই তারজন্য পারফেক্ট চয়েজ। শাকিল অনেকবার আমার কাছে এসে তার লাইফের দুঃখের গল্প বলতে চাইছে আমি পাত্তা দেইনি। ফোন ধরিনা, মেসেজ সীন করিনা। আমি চাইনা এই সময় আমার আর নাবিলার মধ্যে সে আসুক।
.
তারপর ফাইনালি একদিন নাবিলা আমাকে বললো, 'আর্জেন্ট দেখা করেন।'
আমি উড়তে উড়তে গেলাম।
নাবিলা মুচকি হেসে লাজুক গলায় বললো, 'ভেবে দেখলাম আপনার কথাই ঠিক। শাকিলের মত ছেলের জন্য লাইফের গুরুত্বপূর্ণ টাইম নষ্ট করা ঠিক হচ্ছেনা আমার। আমি ডিসিশন নিয়েছি রিলেশনে যাবার। এবং আমি ভেবে বের করেছি কে আমার জন্য একদম পারফেক্ট।'
আমার মনের মধ্যে লাড্ডু ফুটলো। বলললাম, 'বলো নাবিলা, বলে দাও তোমার মনের কথা।'
- বলে দিয়েছি তো।
- কই আমি তো শুনিনি। স্পষ্ট করে বলো।
- উফ আপনি কেন শুনবেন। ঐ ছেলেকে বলেছি। কাল রাতেই। আপনি চিনবেন, ও আমার বেস্টফ্রেন্ড রিয়াদ। ও একসেপ্ট করেছে আমাকে। এজন্য আজ আপনাকে থ্যাংকস জানাতে এসেছি। আপনার কথা থেকেই বুঝেছি ও আমার জন্য পারফেক্ট। ও শাকিলের সাথে আমার রিলেশনের কাহিনী সব জানে, জেনেও মেনে নিতে রাজি। ওর একটা বেস্ট ফ্রেন্ড আছে বিশাল শয়তান। প্লেবয় টাইপ শাকিলের মত। সো আপনার কথা অনুযায়ী ও ভদ্র হবে। তাছাড়া রিয়াদও তার স্বপ্নের মেয়ের জন্য এতোদিন সিঙ্গেল থেকেছে। সবমিলিয়ে ও একদম আপনার মত। সেজন্যই আমি ওকে বেছে নিয়েছি। কারণ আপনি সেটাই বলেছিলেন। ভালো করেছি না?'

হুম ভালোই করেছ, আমি উঠে দাঁড়ালাম। আজ একটু বিজি। ডেন্টিস্টের কাছে যাব। পরে কথা হবে। বাই।
.
প্রচন্ড রাগ হচ্ছিলো। প্রচন্ড। বাসায় এসেই কল দিলাম শাকিলকে। বললাম, 'জানিস নাবিলা ওর ফ্রেন্ড রিয়াদের সাথে রিলেশনে গেছে। কি পরিমানে বাজে একটা মেয়ে। তোর উচিত প্রতিশোধ নেয়া।'
শাকিল হাসলো, 'ধুর, ঐ মেয়ের কথা আমি আর ভাবিই না। আমার লাইফে এখন অন্য আরেকজন এসেছে। মনীষা। মনীষার তুলনায় নাবিলা কিছুই না। আমাকে ভীষণ ভালোবাসে।'
- বাহ ভালো তো।
- আচ্ছা শোন, তোকেই খুজছিলাম। কাল তোর ফ্লার্ট আমাকে দেয়া লাগবে। তুই কোথাও থেকে ঘুরে আয়। না করতে পারবি না। 
- আচ্ছা ঠিক আছে।
.
শাকিল আর মনীষাকে বাসায় দিয়ে আমি ঘুরতে বের হয়েছি। একা একা। কোনো কাজকর্ম নাই। লাইফলেস যাকে বলে। হঠ্যাৎ করে এইসব প্রেম ভালোবাসার উপর প্রচন্ড রাগ হলো। কিন্তু রাগ কোথায় খাটাবো বুঝতেছিনা।

Comments

Popular posts from this blog